বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর তীব্র যানবাহনসংকট কাটাতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৫ হাজার ৮৩০টি নতুন গাড়ি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে পুলিশ সদর দপ্তর দুটি পৃথক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছে। এর মধ্যে সাধারণ ও অভিযান পরিচালনাসংক্রান্ত যানবাহন খাতে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষায়িত যানবাহনের জন্য ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য তোলার কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে পুলিশের মোট ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ৪৫৫টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া সাংগঠনিক কাঠামো ও সাজসরঞ্জাম তালিকায় (টিওঅ্যান্ডই) আগে থেকেই যানবাহনের ঘাটতি ছিল এবং পুরোনো বহু গাড়ি দায়িত্ব পালনকালে বিকল হয়ে পড়ে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় অতিরিক্ত আইজিপি মুশফেকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নয় সদস্যের একটি কমিটি প্রকল্প দুটির সম্ভাব্যতা যাচাই করে। তবে বর্তমান রাজস্ব পরিস্থিতির মধ্যে এত বিপুল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জিপ কেনায় নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি জ্বালানি, মেরামত, টায়ার ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানোর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এবং কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ শীর্ষক প্রথম প্রকল্পে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকায় ৪ হাজার ৮২৯টি গাড়ি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বড় অংশই ব্যয় হবে ডাবল কেবিন পিকআপে; প্রতিটি ৮৬ লাখ টাকা দরে ২ হাজার ৯০৯টি পিকআপ কিনতে প্রয়োজন হবে ২ হাজার ৫০১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। কর্মকর্তাদের জন্য মোট ৭৪৫টি জিপের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা দরে ২ হাজার ৭০০ সিসির ৪০০টি জিপে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭৬ কোটি টাকা এবং ৭৫ লাখ টাকা দরে ২ হাজার সিসির ৩৪৫টি জিপে লাগবে প্রায় ২৫৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এছাড়া ৫২ লাখ টাকা মূল্যের ২১৪টি মাইক্রোবাস কিনতে প্রায় ১১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের পরিবহনে ৫২ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি বড় নন-এসি বাস ও ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দরে ১৪৮টি এসি মিনিবাস কেনা হবে। এই প্রকল্পের তালিকায় আরও রয়েছে ৯৫ লাখ টাকা দরে ১১৫টি প্রিজন ভ্যান, ৬৫ লাখ টাকা দরে ১০০টি প্যাট্রোল কার, ৫৫ লাখ টাকা দরে ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স, ৮০ কোটি টাকায় ১০০টি স্পিডবোট এবং অন্যান্য প্রায় ৩০০টি যানবাহন। এসব গাড়ির দর নির্ধারণ করেছে চার পুলিশ কর্মকর্তা ও বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপকের সমন্বয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের প্রাক্কলন কমিটি।
অন্যদিকে ২ হাজার ২৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ হাজার একটি উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এতে শ্রমিক অসন্তোষসহ বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় ১৩২ কোটি টাকায় ১১টি আর্মড পারসোনেল ক্যারিয়ার (এপিসি), ১২৮ কোটি টাকায় ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ২০টি ওয়াটার ক্যানন, ২২০ কোটি টাকায় ২০টি ক্রাউড কন্ট্রোল ভেহিকেল এবং ১৮৭ কোটি টাকায় সোয়াট ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের জন্য ১৫টি বিশেষ ভ্যান কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া ৫৬ কোটি টাকায় ১০০টি বিশেষ প্যাট্রোল কার, ৪৩ কোটি টাকায় গ্রেপ্তারকৃতদের নিরাপত্তাবেষ্টিত পরিবহনের ১৩টি ভ্যান, ৩৩ কোটি টাকায় ৫৫টি প্রিজন ভ্যান, ১৬০ কোটি টাকায় ২০০টি দ্রুতগতির মোটরসাইকেল, ডগ স্কোয়াডের জন্য ৫৫ কোটি টাকায় ৫০টি ইউটিলিটি টেরেইন ভেহিকেল, দুর্গম পথের জন্য ৫০টি অল টেরেইন ভেহিকেল এবং পাহাড়ি এলাকার জন্য ১০০টি হিল মোটরসাইকেল রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারিতে ১১৪ কোটি টাকায় ৬টি মোবাইল সার্ভিল্যান্স গাড়ি, উপকূল ও নদীতে টহলের জন্য ১৫০ কোটি টাকায় ১৫টি কুইক রেসপন্স বোট, ১৫টি উদ্ধারকারী বোট, ফিল্ড কমান্ডারদের জন্য ১৮৯ কোটি টাকায় ১০৫টি সাব-আরবান ভেহিকেল, ৯৬ কোটি টাকায় ৮০টি ফ্রিজার ভ্যান, ৬০ কোটি টাকায় ৮০টি স্মল ডিপ্লয়মেন্ট ইউটিলিটি ভেহিকেল, ১৪ কোটি টাকায় ঘোড়া পরিবহনের ১০টি যান এবং আরও প্রায় ৫৬টি বিবিধ যান কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রসচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে জানান, অভ্যুত্থানে বিপুলসংখ্যক গাড়ি ধ্বংস হওয়ায় মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের অভিযান পরিচালনায় প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে এবং তাদের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেশি সংখ্যায় পিকআপ কেনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিপুলসংখ্যক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে পুলিশের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা থাকবে। সচিব আরও উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনে গমনকারী সদস্যদের জন্যও কিছু বিশেষায়িত গাড়ি কেনা হচ্ছে, যার আর্থিক ব্যয় পরবর্তীতে জাতিসংঘ থেকে প্রতিপূরণ করা হবে।